বিশেষ দ্রষ্টব্য
– বেড়াতে কে না ভালোবাসে ? কিন্তু সবার বেড়ানো হয়ে ওঠে না ,কিন্তু তা বলে কি কোনো নতুন জায়গা সম্পর্কে জানবো না ? আমার টীম মেম্বার নোয়েল ফাঁক পেলেই ক্যামেরা কাঁধে ফেলে হিমালয়ের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেড়ায়। ওর এবং বাকি টীম মেম্বারদের তোলা ছবি ও ওদের কাছে গল্প শুনে আমারও বেড়ানো হয়ে যায়। এমনি এক সুন্দর জায়গা ‘ইয়েলবং’। নোয়েলের বর্ণনা শুনে আমার লেখা। পাহাড়ী নীড় ইয়েলবং এই সুন্দর নামকরণ করেছে আরেক বন্ধু ,সুমনা। ২২ সে নভেম্বর নোয়েলের জন্মদিনে বিশেষ উপহার স্বরূপ কোলকাতা প্রাইম টাইমে লেখাটি প্রকাশিত হয়। ভ্রমণ প্রেমীদের জন্য লেখাটি শেয়ার করলাম।
পাহাড়ি নীড় ইয়েলবং ( ভ্রমণ কাহিনী )
আমি নোয়েল। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে থাকি। উত্তরবঙ্গের স্থানীয় বাসিন্দা হবার দরুণ প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে আমার সম্পর্কটা একদম মা ও ছেলের মতো। মায়ের মতোই এই প্রকৃতি আমায় অনেক স্নেহ, ভালোবাসা ও পরিচিতি দিয়েছে ; আমিও প্রকৃতি-মায়ের নানান রহস্য জানবার জন্য সবসময় ব্যাকুল হয়ে থাকি। । সবার মুখে ইয়েলবং এর নাম শুনে সেই জায়গায় যাবার প্ল্যান করলাম গতবছর (2020)আনলক হবার পরে, নভেম্বর মাসে ।
পাহাড়ের কোলে বসা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম ইয়েলবংকে ‘হ্যামলেট’ বলা যায়। মানচিত্রে চুইখিমের একটু নিচে নিরিবিলিতে অবস্থিত ইয়েলবং ভীষণ শান্ত,আকর্ষণীয় ও রহস্যময় জায়গা ।
বসতি বলতে পঞ্চান্ন থেকে ষাট খানা বাড়ি আর তিনটে হোমস্টে । বিভিন্ন ধরণের ট্যুরিস্টের সঙ্গে অনেক বয়স্করাও
এই শান্ত পাহাড়ি গ্রাম্য পরিবেশে সময় কাটাবার লোভে এখানে এসে বহুদিন থেকে যায়। রবারস কেভ , ক্যানিয়ন ট্রেক এখানকার মুখ্য আকর্ষণ। ‘রেইনবো ওয়াটার ফল’ ও ‘থ্ৰী স্টেপ ওয়াটার ফল’ খুব সুন্দর বেড়ানোর জায়গা।তাছাড়া এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ও বিশেষ দর্শনীয় ।
কিভাবে যাবেন
শিলিগুড়ি থেকে ইয়েলবং এ আসার ডাইরেক্ট গাড়ি বুক করে নেয়া যায়। বাগরাকোট থেকে প্রথম বাঁ দিকের রাস্তা ধরলে এক ঘন্টার মধ্যে ইয়েলবং পৌঁছনো যায়। কিছুক্ষন রাস্তা ভালো কিন্তু তারপরেই কাঁচা রাস্তা শুরু হয়।
অসম্ভব বাম্পি রোড তাই ৪*৪ হুইলজের গাড়ি না হলে এই জার্নি মোটেও নিরাপদ নয়।
কাঁচা রাস্তা ধরে ইয়েলবং পৌঁছাতে প্রায় আধঘন্টা মতো লেগে যায়। ভোর ছ’টার সময় আমি ও আমার এক বন্ধু পিটার একটা খোলা জিপসিতে বেরিয়ে পড়লাম ইয়েলবং- এর উদ্দেশ্যে। সেবকের রাস্তা হয়ে করোনেশন ব্রিজ পার করে ডুয়ার্স হয়ে বাগরাকোট পৌঁছুলাম। তখন ঘড়িতে বাজে সাতটা। বাগরাকোটে বেশ কয়েকটা খাবার ষ্টল আছে। সেখানে হালকা করে ব্রেকফাস্ট খেয়ে সামান্য জিরিয়ে নিয়ে ইয়েলবঙ্গের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সেখানে দেখি রাস্তা চওড়া হবার কাজ হচ্ছে। প্রচন্ড ধুলোর হাত থেকে নিজেদের ও ইকুইপমেন্টস বাঁচানোর জন্য গাড়ির হুড লাগিয়ে দিলাম।
প্রায় তিরিশ মিনিট ড্রাইভে করবার পরে একটা ডাইভার্শনে পৌঁছলাম।সেখান থেকে ইয়েলবঙ্গের রাস্তায় নামতেই দেখলাম পাথুরে এবড়োখেবড়ো রাস্তা। সেই রাস্তায় গাড়ি চালানো বেশ শক্ত। যাই হোক,আমরা সেই এবড়োখেবড়ো রাস্তায় খুব সাবধানে প্রায় তিরিশ মিনিট ড্রাইভ করে ইয়েলবং গ্রামে পৌছালাম।
কোথায় থাকবেন-
ইয়েলবং গ্রামে ঢুকতেই প্রথম বাড়ি ফ্রান্সিস ভাইয়ের হোমস্টে। ফ্রান্সিস ভাইয়ের পুরো নাম ফ্রান্সিস রাই । ইয়েলবং জায়গাটিকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ফ্রান্সিস ভাইয়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। আমি আগেই ওনার সাথে যোগাযোগ করে ওনার হোমস্টেতে রুম বুক করে রেখেছিলাম। ফ্রান্সিস ভাই আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। সাদর অভ্যর্থনা করে আমাদের থাকার ঘরটিতে নিয়ে গেলেন। খুব ছিমছাম খোলামেলা ঘর। পরিষ্কার বিছানা পাতা এবং নিত্য দরকারি সব জিনিসই সেখানে রাখা ছিল।
এই হোমস্টেতে টেন্টেরও ব্যবস্থা আছে। কেউ যদি এডভেঞ্চারপ্রিয় হয় সে অনায়াসে খোলা আকাশের নীচে নিরাপদে এই টেন্টে রাত কাটাতে পারে ; তারসাথে ফায়ার প্লেসেরও ব্যবস্থা আছে।
ঘরে জিনিসপত্র রেখে ফ্রান্সিস ভাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে চা ও রিফ্রেশমেন্ট পর্ব শেষ করে আমরা ওখানকার স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে দেখা করলাম। এনারা খুবই অতিথিবৎসল এবং সহজ সরল প্রকৃতির। কাজেই খুব একটা সময় লাগলো না সবার সাথে মিশে যেতে। দুপুরে লাঞ্চের পরে জায়গাটা দেখবার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। কিছু পাখির দেখা পেলাম ও ছবি তুললাম। ধীরে ধীরে সূর্যাস্তের সময় হয়ে এলো। প্রথমেই বলেছি,এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত খুব সুন্দর। অতএব আমরাও বেলা শেষে সূর্যাস্তের ছবি তুললাম।

সন্ধেবেলা, ফ্রান্সিস ভাই আমাদের ওখানকার একটি স্কুলে নিয়ে গেলেন। সেখানে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের প্রোগ্রাম ছিল। উপস্থিত সকলের সঙ্গে ফ্রান্সিস ভাই আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য পাহাড়ি এলাকার এই ছেলেমেয়েরা সমতলের তুলনায় লেখাপড়া করার সুযোগ সুবিধা অনেক কম পায়। ফলে, উচ্চ শিক্ষার ইচ্ছে থাকলেও প্রকৃত সুবিধা ও অর্থাভাবে সেই ইচ্ছে পূরণ হয় না। কাজেই এখানকার সবাইকে জীবিকার জন্য সারাবছরই ট্যুরিস্টদের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করতে হয়। বেকারী এই সব অঞ্চলের অন্যতম সমস্যা যা কোরোনার দাপটে আরো বেড়ে গেছিলো। অন্য শহরে গিয়ে রোজগারের রাস্তাও তখন বন্ধ।
বিকল্প হিসেবে বাড়িতে থেকেও বার্ডিং ও ট্যুরিস্ট গাইডিংয়ের মাধ্যমে রোজগার করা যেতে পারে আমাদের এই প্রস্তাব উপস্থিত সকলেরই খুব ভালো লাগে। অনুষ্ঠানের শেষে আমরা আবার হোমস্টে তে ফিরে যাই ও সেখানেই ডিনারে স্থানীয় খাবার খুব তৃপ্তি করে খাই। ডিনারের শেষে ফায়ার প্লেসে সবাই গোল হয়ে বসে স্থানীয় লোকজন বার্ডিং ফিল্ড এ কিভাবে কাজ করবে সেইসব আলোচনা করে ঠিক করে নিয়েছিলাম।
পরদিন ছিল, স্থানীয় মানুষদের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে হাতেকলমে তাদের পাখি চেনানোর চেষ্টার সময়।
কিছু পাখির স্পিসিস পেয়েছিলাম সেগুলোর নাম দেয়া থাকলো
Birds list : Sultan tit Scarlet minivet, Asian barred owlet, Canary flycatcher, Long tailed broadbill, Snowy browed flycatcher, White browed scimitar babbler, Great hornbill ,Yellow bellied warbler, White crested laughing thrush Grey bellied tesia, Black crested bulbul ইত্যাদি।

স্থানীয় ছেলেরা খুব উৎসাহের সঙ্গে আমাদের কাছে ‘বার্ড গাইড’ হবার খুঁটিনাটি শিখে নিলো। ওদের একটা রোজগারের পথ দেখাতে পেরে অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছিলাম।

কিভাবে দুদিন পেরিয়ে গেলো তা বুঝতেই পারলাম না। আমরা দু রাতই টেন্টে কাটিয়েছিলাম।
এবারে ফিরে আসার পালা। সবাইকে বিদায় জানিয়ে যখন গাড়িতে বসলাম, মনে হলো, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি ! প্রকৃতির রহস্য জানতে হলে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতে হবে। ইয়েলবং এর পরিচিতি শুধুমাত্র গুহা বা ঝর্না নয় এখানে বিভিন্ন ধরণের ওয়াইল্ড লাইফ এর বিষয়ও আছে। অদূর ভবিষ্যতে সেইগুলো জানবার জন্য আবার ফিরে আসবো পাহাড়ের কোলে এই শান্ত গ্রামে। ।
অনু লেখন – অজন্তা প্ৰবাহিতাছবি তুলেছেন -নোয়েল ফোনিং |
