কলমে – অজন্তাপ্রবাহিতা

pc courtesy – Google image
A happy childhood is perhaps the most fortunate gift in life – Dorothy Richardson
শৈশব মানুষের জীবনের খুব ব্যক্তিগত এবং কখনো কখনো স্পর্শকাতর একটি জায়গা। রবীন্দ্রনাথের মতো মহান প্রতিভার রচনায় শিশু ও কিশোর দুটি মাত্রা পেয়েছে। একটি রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত, অর্থাৎ শিশু ও পরবর্তী কালে কিশোর হিসেবে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অন্যটি তাঁর রচনার শিশু ও কিশোর চরিত্র গুলি। বলাই বাহুল্য ক্লাসিক সাহিত্যের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের শিশু ও কিশোর চরিত্ররা শুধুমাত্র মানুষের জীবনের বিশেষ একটি বয়সের চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে মানবজীবনের নানান সত্য উপলব্ধির মাত্রাও যোগ করেছে।
কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোর?‘জীবনস্মৃতি’ রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে জানার জন্য সব থেকে নির্ভরযোগ্য উৎস। তুলনায় কম পরিচিত অন্য বইটি ‘ছেলেবেলা’। আর পাঁচজন মানুষের থেকে রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা অনেক আলাদা। ঠাকুর পরিবারের রীতিনীতি অনুযায়ী ভূমিষ্ঠ হবার সঙ্গেসঙ্গেই সন্তানদের দাসীদের হাতে তুলে দেয়া হতো। ওনার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয় নি। জন্মের পরে মায়ের কোলে বড় না হয়ে ধাত্রীর কোলে বড় হন। রবীন্দ্রনাথের ধাত্রীমাতার নাম ছিল দিগম্বরী ওরফে দিগমী।
জীবনস্মৃতি থেকেই জানা যায় — “আমাদের এক চাকর ছিল, তাহার নাম শ্যাম… সে আমাকে ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসাইয়া আমার চারিদিকে খড়ি দিয়া গন্ডি কাটিয়া দিত। গম্ভীর মুখ করিয়া তর্জনি তুলিয়া বলিয়া যাইত, গন্ডির বাহিরে গেলে বিষম বিপদ।” ছোটদের জীবনের মুক্তির আনন্দ, অসীম স্বাধীনতা সেখানে নেই। নিয়মের প্রাচীরে বন্দি রবীন্দ্রনাথের শৈশব মোটেও সুখস্মৃতি বহুল ছিল না।
পাঁচ বৎসর বয়স হবার আগেই গুরুমশাই মাধবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাড়িতেই ওঁনার বিদ্যাশিক্ষার সূত্রপাত হয়। তিনি সেকেলে পন্ডিতের এক জ্বলন্ত আদর্শ। অপরাধে, বিনা অপরাধে যখন তখন সেই বেতের বাড়ি ছাত্রদের পিঠে পড়তো। এরপরে বাকি দাদাদের সঙ্গে ওরিয়েন্টাল সেমিনারী স্কুলে যাবার জন্য অনেক কান্নাকাটি করে স্কুলে গেলেন বটে ,কিন্তু স্কুলের চারদেয়ালের শিক্ষা ব্যবস্থায় ওঁনার দম আটকাতে শুরু করলো। স্কুলের শিক্ষার প্রতি এই অনাগ্রহী মনোভাব দেখে পিতা দেবেন্দ্রনাথ বাড়িতেই শিশু রবির শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। নিয়মানুবর্তিতার পরিবেশে তাঁকে অন্তর্মুখী করে তুলেছিল। ছোট রবি যখন রবীন্দ্রনাথ হলেন তখন তাঁর নানা সৃষ্টিতে ছোটদের মনের অনুভব ধরা দিলো।
রবীন্দ্রনাথ শিশুকাব্যের অন্তর্গত “পুরোনো বট” কবিতায় জনৈক মাধব গোঁসাইয়ের উল্লেখ করেছেন, ওখানেতে পাঠশালা নেই ,/ পন্ডিতমশাই /বেত হাতে নাইকো বসে মাধব গোঁসাই।
কাহিনীকার (story teller) রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শিশু চরিত্ররা-গল্পগুচ্ছ নিজগুণে এক অনবদ্য সংকলন। এখানে ছোটগল্পের শিশুচরিত্রগুলি আমাদের মনের বেদনার তন্ত্রীটিতে ঘা দিয়ে যায়। কতভাবে যে তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশটা ঠিক যথাযথ হয়ে ওঠে না, তা বড়রা যেন বুঝতেই চায় না।
গিন্নি গল্পের নায়ক আশুতোষ। শিক্ষকের প্রতাপ জাহির হয় বাঁধভাঙা নিষ্ঠুরতায়। কখনও কখনও প্রহারের চেয়ে তির্যক মন্তব্য ও বিদ্রুপবাণী দুঃসহ যন্ত্রণা দেয়। আশুর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেছিল শিবনাথ পণ্ডিতের হাতে।
ছুটি গল্পের ফটিক ছিল পিতৃহীন। দরিদ্র পরিবারে বিধবা মায়ের পক্ষে ঠিকমতো শৈশবের পরিচর্যা করাও সম্ভব হয়নি। মামার বাড়িতে মামীর অত্যাচার ও অনাদরে ফটিকের প্রাণ বিপন্ন হয়ে এলো , শেষ ইচ্ছে ছিল মায়ের কাছে ফিরে যাবার, কিন্তু সেই ইচ্ছের শেষ রক্ষে হয় নি।
অতিথি গল্পের তারাপদ আবার অন্যরকম ছেলে। ভারি সুন্দর, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। খুব গুণী, গাইতে পারে ভালো, চট করে যে কোনো কাজ শিখে ফেলে, এমনকি রান্না পর্যন্ত। পুঁথি পড়ে চমৎকার। বড়দের মন জয় করতে ওস্তাদ। কিন্তু ওর ভেতরে একটা মন আছে বড্ড উদাসি। এমন ছেলে তারাপদকে ভালো না লেগে পারা যায় না।
পোস্টমাস্টার গল্পের রতন মাত্র ৮-৯ বছরের মেয়ে। পুতুল খেলার বয়স। কিন্তু দারিদ্রের কারণে তাকেও কাজ করে খেতে হয়। আর সেকালে মেয়েদের অল্পবয়সে বিয়ে হত, অল্প বয়সেই গৃহস্থালি কাজকর্ম শিখতে হত। ঐ বয়সে রতন কিনা গাঁয়ের পোস্টমাস্টারের গৃহকর্ম করত। পোস্টমাস্টার চেষ্টা-তদ্বির করে শহরে বদলি নিলেন। তাঁর জন্য সেটাই ছিল স্বাভাবিক কাজ। তাঁরা অসমবয়সী, অসম তাঁদের সামাজিক অবস্থান, তার উপর রতন নিতান্ত শিশু। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিদায়ের সময় বোঝা গেল মনটা কীভাবে বাঁধা পড়েছিল।
এভাবে আমরা কাবুলিওয়ালার মিনিকে পাব– যার বয়স মাত্র পাঁচ। কিন্তু ঐ পুঁচকে মেয়েটিও দাগ কাটে মনে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শৈশব-রবীন্দ্রনাথের অগণিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘কড়ি ও কোমল’, ‘ শিশু ‘, ‘ শিশু ভোলানাথ’ ইত্যাদি শিশুদের জন্য এবং শিশুদের নিয়ে লেখা বহু পরিচিত কবিতা সংকলন। ‘সাত ভাই চম্পা’ অথবা ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ বাঙালি শিশুর শুনে শুনে শেখা প্রথম ছড়া। কবিতা গুলো তে কবি মা এর প্রতি বারবার সম্বোধন করেছেন। ঠাকুর বাড়ির পাশ্চাত্য রীতি মেনে মা ও শিশুর যে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন সেই না পাওয়া, সাধারণ শিশু জীবনের ছবি উঠে এসেছে বারবার। কবিতায় শিশু মনের চাওয়া ও না-পাওয়া খুব স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। শিশুর জীবনের সরল যাপন, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে মা ও সন্তানের আড়ম্বর হীন সম্পর্কের ছবি মানুষের খুব চেনা সম্পর্কের মাধুর্য কে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। মা ও শিশুর কথোপকথনের ভঙ্গি খুব মনোরম।বীরপুরুষ কবিতায় শিশু নিজেকে বীর বলে ভাবে। সেই কল্পনার রণক্ষেত্রে মায়ের রক্ষাকর্তা সবচেয়ে শক্তিশালী সন্তান মায়ের কোনো ক্ষতি হতে দেয়নি। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো পরিণত বয়সে রচনা করলেও, কবিতাগুলির মধ্যে মা ও সন্তানের নির্মল সম্পর্কের বিষয়টি অটুট রয়েছে। বাস্তবে স্নেহ বঞ্চিত এক মানবশিশুর কল্পনার জগতে মাতৃস্নেহের কোনো অভাব রাখেননি কবি।
শিশুদের জন্য রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি-বাঙালির সন্তান রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের মধ্য দিয়েই তাঁকে প্রথম চেনে। ‘মেঘের কোলে রোদ ‘ অথবা ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা ‘ সম্ভবত সবার চেনা রবীন্দ্রসংগীত যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়, শিশুমন বন্ধনহীন জীবনের আশ্বাস পায়।
বাংলার নবজাগরণে ঠাকুরবাড়ির ভূমিকার কথা সকলের জানা। সেক্ষেত্রে রঙ্গমঞ্চে নৃত্যনাট্য ও নাটক অভিনয় একটি নিয়মিত বিষয় ছিল। যেহেতু পরিবারের সদস্যরাই অভিনয় করতেন, শিশুকেন্দ্রিক পরিবেশনাও হতো। রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকি প্রতিভা, মুকুট, তাসের দেশ, ডাকঘর, তোতাকাহিনী ইত্যাদি সৃষ্টির কথা এখানে উল্লেখ্য।
ডাকঘর নাটকের অমল , অসুস্থতার কারণে যাকে বন্দি করে রাখা হয় সেই অমলের স্বপ্নকে কেউ বন্দি করতে পারে নি। সাধারণ মানুষের জীবিকা ও জীবন থেকে সে বিচ্ছিন্ন। এক সুদূর কল্পজগৎ তাকে আশা দেখায়, মুক্তির আশা।
ইচ্ছাপূরণ, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি রচনায় মূলত শিশুদের জন্য এবং শিশু চরিত্র কেন্দ্রিক।
রবীন্দ্রনাথের শিশুচরিত্র নাকি বিশেষ বার্তাবাহক (special messenger) ?কালজয়ী সাহিত্যিকদের রচনার কিছু বিশেষত্ব থাকে। রবীন্দ্রনাথের শিশু চরিত্র গুলো যেন বড়দের কেজো জগতে আয়নার মত। কবিতায় শিশুর সরল প্রশ্ন, ছোট গল্পের যে কিশোরের না বলা অভিমান – এই সব সাধারণ মানবিক বিষয় তুলে ধরার মাধ্যম সব চরিত্র গুলি। আপাত গল্প কথনের আড়ালে কখনো satire আবার কখনো comedy বা tragedy র মধ্য দিয়ে বারবার জীবন সম্পর্কে কোনো না কোনো একটা বৃহত্তর বার্তা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ ও শিশুশিক্ষা
শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর দর্শনের প্রয়োগ করেছেন অত্যন্ত নিপুণ ভাবে। শিশুর উপযোগী শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর দিকদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের বিকাশসাধন, সৌন্দর্যবোধের বিকাশ, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং পরমসত্তার উপলব্ধি। রবীন্দ্র শিক্ষা ভাবনার শ্রেষ্ঠ অবদান বিশ্বভারতী বিশ্ব বিদ্যালয় (১৯২১) যার প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৯০১ সালে বীরভূমের বোলপুরে শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক বিদ্যালয় ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রতিষ্ঠা।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃ ভাষাকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধবৎ। তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন।’ ‘ সহজ পাঠ ‘ সত্যিই পঠন পাঠন কে সহজ করে দিয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য ভাবধারার সমন্বয় ঘটানাের কথাও বলেছেন।প্রথাগত বিদ্যালয়ের চার দেওয়াল নয়, প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনকেই তিনি শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ বলে মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতা ও জীবন দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। সকল প্রজন্মের শিশু ও কিশোর মনস্তত্বকে তাঁর মতো করে উপলব্ধি করে সুস্থ মানবিক বিকাশের পথ দেখানো আমাদের এক বিরল প্রাপ্তি।
অধ্যাপক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ বলেছেন ” Rabindranath Tagore was undoubtedly the greatest leader of the Indian Renaissance and his influence was felt in all of our cultural life. Education did not escape it.
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
(বিশেষ ধন্যবাদ সুমনা আজাদকে। ওনার পথপ্রদর্শন ছাড়া এই লেখা সম্ভব হয়ে উঠতো না।)
অজন্তা প্রবাহিতা